
দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে স্থিতিশীলতা ফিরছে না। কখনো লেনদেন বাড়ছে, আবার পরের মাসেই তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন ৬৬৩ কোটি টাকায় উঠলেও মে মাসে তা নেমে আসে মাত্র ৭৪ কোটি টাকায়। সর্বশেষ চলতি অক্টোবর মাসের প্রথমার্ধেও তাদের লেনদেন কমেছে। এ সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন হয়েছে ২১৪ কোটি টাকা, যা গত সেপ্টেম্বরের শেষার্ধের ৩৪৬ কোটি টাকার তুলনায় ৩৮ শতাংশ কম।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন ছিল ৩৭৭ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ৬৬৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তবে মার্চে লেনদেন কমে ২৭২ কোটি টাকা এবং এপ্রিলে ১৭৫ কোটি টাকায় নেমে আসে। মে মাসে লেনদেন আরও কমে হয় মাত্র ৭৪ কোটি টাকা। এরপর জুনে তা বেড়ে ৫৪০ কোটি এবং জুলাইয়ে ৫২৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। আগস্টে লেনদেন কমে ৩১৯ কোটি টাকায় এলেও সেপ্টেম্বরে তা আবার বেড়ে ৫৮১ কোটি টাকা হয়।
তবে মাসের ব্যবধানে লেনদেনের এই উত্থান-পতন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে ধারাবাহিকতা না থাকার চিত্র তুলে ধরে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১৩ মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মোট ৪ হাজার ৭০৭ কোটি টাকার লেনদেন করেন।
সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা।
শুধু শেয়ার লেনদেনের ক্ষেত্রেই নয়, দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ডবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের নিট অবস্থানও কয়েক বছর ধরে নেতিবাচক। ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে দেশীয় ঋণ সিকিউরিটিজে বিদেশি বিনিয়োগের নিট প্রবাহ ঋণাত্মক হয়ে পড়ে।
পরের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের বহিঃপ্রবাহ কমে ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকায় নেমে আসে। তবে সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে কয়েক বছর ধরেই দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ডবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের নিট প্রবাহে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
দীর্ঘমেয়াদি চিত্রেও দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা কমার প্রবণতা স্পষ্ট। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এক্সচেঞ্জটিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা। ওই বছর ডিএসইর মোট লেনদেনে তাঁদের অংশগ্রহণের হার ছিল ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
২০১৭ সালে বিদেশিদের লেনদেন বেড়ে ১১ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকায় দাঁড়ালেও মোট লেনদেনে তাঁদের অংশগ্রহণ কমে হয় ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যথাক্রমে ৯ হাজার ২৭৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮২৩ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন করেন। এ দুই বছরে মোট লেনদেনে তাঁদের অংশগ্রহণের হার ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৪৮ ও ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
কোভিড মহামারির বছর ২০২০ সালে বিদেশিদের লেনদেন বেড়ে ১০ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ওই বছর ডিএসইর মোট লেনদেনে তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। তবে পরের বছর থেকেই এ চিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২১ সালে মোট লেনদেনে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে ১ দশমিক ১০ শতাংশে নেমে আসে। ওই বছর তাঁদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা।
২০২২ ও ২০২৩ সালে বিদেশিদের অংশগ্রহণ আরও কমে যায়। এ দুই বছরে ডিএসইর মোট লেনদেনে তাঁদের অংশগ্রহণের হার ছিল যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৮৯ ও শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশ। টাকার অঙ্কে লেনদেনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪ হাজার ১৮০ কোটি ও ২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা।
২০২৪ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ৯২৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তবে ডিএসইর মোট লেনদেনে তাঁদের অংশগ্রহণের হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের ওঠানামার পেছনে পুঁজিবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি, শেয়ারদরের প্রবণতা, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সুযোগসহ বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনে সাময়িক বৃদ্ধি দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা এখনো তাদের অংশগ্রহণে স্থিতিশীল প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে না। কয়েক বছর ধরে নিট বিনিয়োগের বহিঃপ্রবাহ এবং ডিএসইর মোট লেনদেনে তাঁদের অংশগ্রহণের হার কম থাকা দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা ফিরে আসার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।