প্রোটিকপ্রকাশিত: মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬ ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ
অর্থনীতির গতি, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি দ্রুত বুঝতে পারচেজিং ম্যানেজারস’ ইনডেক্স (পিএমআই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশের আগেই ব্যবসা খাতের কর্মকাণ্ডের পরিবর্তনের আভাস পাওয়ায় অর্থনীতির স্বল্পমেয়াদি গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে এ সূচক কার্যকর ‘আর্লি-ওয়ার্নিং’ বা আগাম সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানের পুলিশ প্লাজায় মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) শাখা কার্যালয়ে আয়োজিত পিএমআই-সংক্রান্ত এক সেমিনারে উপস্থাপিত প্রেজেন্টেশনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এমসিসিআই ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডাম অ্যাস্পডেন, এমসিসিআইয়ের মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফারুক আহাম্মাদ এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও সিনিয়র ম্যানেজার হাসনাত আলম উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে বলা হয়, পিএমআই মূলত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের গতি ও পরিবর্তনের একটি সূচক। নতুন অর্ডার, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ইনপুটের দাম, সরবরাহকারীদের সরবরাহের সময়, মজুত, অসম্পন্ন অর্ডার এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এ সূচক তৈরি করা হয়।
জরিপে প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মাসের তুলনায় পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে, অপরিবর্তিত রয়েছে নাকি অবনতি হয়েছে— তা জানায়। সাধারণভাবে পিএমআই-এর স্কোর ৫০-এর বেশি হলে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ এবং ৫০-এর নিচে হলে সংকোচন বোঝায়।
তবে পিএমআই-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্রুত প্রকাশ। সরকারি জিডিপি, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান প্রকাশে সময় লাগলেও পিএমআই তুলনামূলকভাবে দ্রুত পাওয়া যায়। ফলে অর্থনীতিতে পরিবর্তনের প্রাথমিক সংকেত আগে থেকেই পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ধাক্কা সামলানোর চিত্রও মেলে
বাংলাদেশের পিএমআই-এর সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতিতেও অর্থনীতির বিভিন্ন ধাক্কার প্রতিফলন দেখা গেছে বলে সেমিনারের প্রেজেন্টেশনে উল্লেখ করা হয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন, কারফিউ ও ১০ দিনের ইন্টারনেট বন্ধের প্রভাবে পিএমআই আগের মাস জুনের তুলনায় ২৭ পয়েন্ট কমে ৩৬ দশমিক ৯-এ নেমে আসে। অর্থাৎ ওই সময় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য সংকোচনের চিত্র পাওয়া যায়।
২০২৫ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে দীর্ঘ সরকারি ছুটি, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কসংক্রান্ত চাপ এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতার প্রভাবে পিএমআই ৮ দশমিক ৮ পয়েন্ট কমে যায়। একই বছরের অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মধ্যে বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হওয়া, রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া এবং জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিনিয়োগ স্থগিত রাখার কারণে সূচক ৭ দশমিক ৮ পয়েন্ট কমে।
২০২৬ সালের মে থেকে জুনেও পিএমআই কমেছে। দীর্ঘ ঈদের ছুটি, বর্ষার শুরু, ঈদের আগে চাহিদা কমে যাওয়া এবং নতুন ১৫ শতাংশ ভ্যাটের প্রভাবে এ সময় পিএমআই ৯ দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে ৫২ দশমিক ৯-এ দাঁড়ায়। যদিও সূচক ৫০-এর ওপরে থাকায় এ সময় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সম্প্রসারণের ইঙ্গিতই ছিল।
৪০০ প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ
বাংলাদেশের পিএমআই তৈরির জন্য প্রতি মাসে কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা— এই চার খাতের মোট ৪০০টি প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে কৃষি খাতের ৪৬টি, উৎপাদন খাতের ৯২টি, নির্মাণ খাতের ৫০টি এবং সেবা খাতের ২১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
নতুন অর্ডার, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ইনপুটের দাম, সরবরাহকারীদের সরবরাহের সময়, অসম্পন্ন অর্ডার এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন সূচক এতে বিবেচনা করা হয়। ফলে ব্যবসার বর্তমান অবস্থা যেমন বোঝা যায়, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ প্রত্যাশারও একটি ধারণা পাওয়া যায়।
জিডিপির সঙ্গে সম্পর্ক
সেমিনারে আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, পিএমআই-এর সঙ্গে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোজোনের ক্ষেত্রে পিএমআই এবং সর্বশেষ জিডিপি অনুমানের মধ্যে ৮২ শতাংশ পর্যন্ত সম্পর্ক পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। মহামারির আগের সময়ে ত্রৈমাসিক পিএমআই এবং প্রথম জিডিপি অনুমানের মধ্যে এ সম্পর্ক ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত ছিল বলেও জানানো হয়।
এর ফলে সরকারি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান প্রকাশের আগেই অর্থনীতির সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পেতে পিএমআই ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে নাকি কমছে, চাহিদার অবস্থা কেমন এবং মূল্য ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে কি না— এসব বিষয়ে দ্রুত ধারণা পাওয়া সম্ভব।
নীতিনির্ধারণে সহায়ক হতে পারে
পিএমআই-এর তথ্য অর্থনীতির সম্ভাব্য দুর্বলতা বা ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে। কোনো সময়ে নতুন অর্ডার, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ধারাবাহিক দুর্বলতা দেখা দিলে তা অর্থনীতিতে সম্ভাব্য মন্দার সংকেত দিতে পারে। আবার উৎপাদন ও নতুন অর্ডারে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।
একইভাবে ইনপুটের দাম বেড়ে যাওয়া বা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন দেখা দিলে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও আগেভাগে বোঝা যেতে পারে। এসব তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নীতিনির্ধারকদের মুদ্রানীতি, শিল্প ও বাণিজ্যনীতি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে।
ব্যবসায়ীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ
পিএমআই কেবল সরকারের নীতিনির্ধারণের জন্য নয়, বেসরকারি খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সরবরাহকারী নির্বাচন ও দরকষাকষি, উৎপাদন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত, ব্যবসার ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানগুলো এ তথ্য ব্যবহার করতে পারে।
এ ছাড়া, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, শেয়ার ও বন্ডবাজার, বৈদেশিক মুদ্রা ও পণ্যবাজারের প্রবণতা বিশ্লেষণেও পিএমআই সহায়ক হতে পারে। বাজারে চাহিদা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য ব্যয়চাপ সম্পর্কে দ্রুত ধারণা পাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও এটি কাজে আসতে পারে।
খাতভিত্তিক পিএমআই-এর ওপর গুরুত্ব
বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধি খাতগুলো সম্পর্কে আরও নির্দিষ্ট ধারণা পেতে খাতভিত্তিক পিএমআই-এর পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সেমিনারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক (আরএমজি), ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) এবং সেবা খাতের জন্য আরও বিস্তৃত ও নির্ভরযোগ্য পিএমআই তথ্য তৈরি করা গেলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাসের সক্ষমতা বাড়বে বলে প্রেজেন্টেশনে উল্লেখ করা হয়।
এর পাশাপাশি ব্যবসায়িক আস্থা সূচকের সঙ্গে পিএমআই সমন্বয় করা গেলে অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা-দুই দিক থেকেই আরও কার্যকর চিত্র পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন
সেমিনারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক তথ্যের প্রাপ্যতা, সময়ানুবর্তিতা এবং বিশ্লেষণ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিয়মিত ও দ্রুত জরিপের মাধ্যমে অর্থনীতির পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া গেলে নীতিনির্ধারণ আরও তথ্যনির্ভর করা সম্ভব।
বিশ্বের যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোজোন, চীন, ভারত ও জাপানের মতো প্রধান অর্থনীতিতে পিএমআই নিয়মিত প্রকাশ ও ব্যবহার করা হয়। এসব দেশে সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আন্তর্জাতিক সংস্থা, গবেষক, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বল্পমেয়াদি গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য এ সূচক অনুসরণ করেন।
বাংলাদেশের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে তাই পিএমআই-এর গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে অর্থনীতিতে কোনো ধাক্কা দেখা দিলে সরকারি পরিসংখ্যানের জন্য অপেক্ষা না করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দ্রুত পরিস্থিতির ধারণা পাওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে খাতভিত্তিক পিএমআই-এর পরিধি ও তথ্যের মান উন্নত করা গেলে অর্থনৈতিক পূর্বাভাস, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণের সক্ষমতাও আরও শক্তিশালী হতে পারে।
URL কপি করা হয়েছে৷
প্রোটিকপ্রকাশিত: মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬ ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ