সাহিত্য

‘নিজেকে ব্যর্থ লেখক মনে হয়’

‘লেখক হিসেবে কিঞ্চিৎ সাফল্য পেয়েছি, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে নিজেকে একজন ব্যর্থ লেখকও মনে হয়।’ নিজের দীর্ঘ লেখকজীবনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে এমন আত্মসমালোচনামূলক মন্তব্য করেছেন কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকার। তিনি বলেন, একজন লেখকের সাফল্য নির্ভর করে তার লেখা পাঠকের মনে কতটা স্থায়ী দাগ কাটতে পারে তার ওপর।

‎কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকারের ৭৩তম জন্মদিন উপলক্ষে মঙ্গলবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে তার দুটি নতুন গ্রন্থ—গল্পগ্রন্থ ‘শখের বাগানে সাপ’ ও উপন্যাস ‘নিয়ন্ত্রক’ নিয়ে এ গ্রন্থোৎসবের আয়োজন করে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনুপ্রাণন। এদিন ছিল মঞ্জু সরকারের জন্মদিনও।

‎তবে নিজেকে ‘ব্যর্থ লেখক’ মনে হলেও এতে মঞ্জু সরকার হতাশ নন। লেখকের জীবনকে পৌরাণিক চরিত্র সিসিফাসের পাথর ঠেলে পাহাড়ের চূড়ায় তোলার সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘একটা বই ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করতে হবে। এই চেষ্টার মধ্যেই লেখকের আনন্দ, এই চেষ্টাই তার জীবন, এই চেষ্টাই ভালোবাসা।’

‎মঞ্জু সরকার বলেন, ‘আমি সামনে আরও ভালো কিছু লেখার চেষ্টা করছি। এমনকি ইউসুফ ভাইকে বলেছি, আমার মাস্টারপিস (মওলানা ভাসানী ওপর বই) সামনে আসছে।’ নিজের লেখালেখির প্রতি এই প্রত্যয় নিয়েই আমৃত্যু লিখে যাওয়ার কথা জানান তিনি।

‎অনুষ্ঠানের শুরুতে রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি’ এবং নজরুলসংগীত ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম, মোরা ঝর্নার মতো চঞ্চল’ পরিবেশন করে কিরণ সংস্কৃতি সদনের শিশুরা।

‎স্বাগত বক্তব্য দেন অনুপ্রাণনের সম্পাদক ও প্রকাশক আবু মোহাম্মদ ইউসুফ। মঞ্জু সরকারের দুটি গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করেন লেখক, গবেষক ও প্রকাশক মফিদুল হক; শিক্ষাবিদ ও লেখক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস; প্রাবন্ধিক ও লেখক চৌধুরী মুফাদ আহমদ; কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিস; এবং নাট্যকার, নাট্যনির্মাতা ও চলচ্চিত্রকার গিয়াসউদ্দিন সেলিম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার।

‎নিজের জন্মদিনকে কেন্দ্র করে এমন আয়োজনের জন্য প্রকাশক আবু মোহাম্মদ ইউসুফসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান মঞ্জু সরকার। তিনি বলেন, লেখকের সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো তার বই নিয়ে পাঠক ও সমালোচকদের আলোচনা শোনা। সাধারণত বই প্রকাশের পর পাঠকরা কীভাবে তা গ্রহণ করেছেন, একজন লেখকের পক্ষে তা জানা কঠিন। কিন্তু এই আয়োজনে দেশের বিশিষ্ট লেখক-সমালোচকেরা তার বই নিয়ে আলোচনা করেছেন—এটিকে তিনি বিরল অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেন।

‎অনুষ্ঠানে লেখক ও গবেষক মফিদুল হক বলেন, মঞ্জু সরকার একজন অসাধারণ ‘স্টোরিটেলার’। তার লেখায় একদিকে প্রান্তিক ও অন্ত্যজ মানুষের জীবন, অন্যদিকে বৃহৎ রাজনৈতিক বাস্তবতা উঠে এসেছে। ‘শখের বাগানে সাপ’ গল্পগ্রন্থের ‘গৃহপালিত গরুর গতিপথ’ ও ‘কুড়ানি বুড়ি’ গল্পের প্রশংসা করে তিনি বলেন, অতি সামান্য ঘটনা ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে মঞ্জু সরকার মানুষের গভীর জীবনবাস্তবতা, স্বপ্ন, বেদনা ও সমাজের পরিবর্তন তুলে ধরেছেন। অন্যের জীবনের বেদনা ও বাস্তবতা গভীরভাবে উপলব্ধি করার ক্ষমতাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‎খালেকুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, মঞ্জু সরকার একজন জাত কথাশিল্পী ও শক্তিশালী লেখক। দীর্ঘদিন ধরে লিখলেও তিনি প্রাপ্য প্রচার ও স্বীকৃতি পাননি। সমাজ ও মানুষকে দেখার গভীর দৃষ্টি এবং সমকালীন বিষয়কে সাহিত্যে তুলে ধরার ক্ষমতাই তার বড় শক্তি। মঞ্জু সরকারের সক্রিয়ভাবে লিখে যাওয়ার প্রশংসা করে তিনি তার কলম শেষ সময় পর্যন্ত সক্রিয় থাকার প্রত্যাশা জানান।

‎নাসিমা আনিস বলেন, মঞ্জু সরকার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কথাশিল্পী। তার লেখায় সমাজের গভীর বিশ্লেষণের পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতি, রাজনীতি, পারিবারিক সম্পর্ক, অবিশ্বাস, সন্দেহ ও ভণ্ডামির চিত্র উঠে এসেছে। তার সাহিত্য পড়া মানে নিজের সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতাকেই নতুন করে পড়া।

‎সৈয়দ মুফাদ আহমেদ বলেন, ‘নিয়ন্ত্রক’ উপন্যাসে পারকিনসন্সে আক্রান্ত একজন মানুষের অন্তর্গত মনোজগতের পাশাপাশি সমাজ ও পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে। আর ‘শখের বাগানে সাপ’ গল্পগ্রন্থে সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার চিত্র স্পষ্ট। তবে উপন্যাসে কিছু জায়গায় অতিরিক্ত তথ্যনির্ভর বর্ণনা এবং যৌনতার ব্যবহারে আরও সংযম প্রয়োজন ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‎গিয়াসউদ্দিন সেলিম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মঞ্জু সরকারের লেখার সঙ্গে তার পরিচয়। তার ‘অবগুণ্ঠন’ উপন্যাস অবলম্বনে তিনি টেলিভিশন সিরিজ নির্মাণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধকে মঞ্জু সরকার যেভাবে সাহিত্যে তুলে ধরেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে অনন্য। তার মতে, মঞ্জু সরকার বড় মাপের লেখক হলেও অনেকটাই নিভৃতচারী এবং প্রাপ্য পরিচিতি পাননি।

‎অনুষ্ঠানে মঞ্জু সরকারের সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করে একটি গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগের কথাও জানানো হয়। তার অর্ধশতাধিক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস, ছোটগল্প, শিশু-কিশোর সাহিত্য ও ব্যক্তিগত নিবন্ধ। সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি ১৯৯৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আবাসিক লেখক কর্মসূচিতেও অংশ নেন তিনি।

‎আলোচনা শেষে সংস্কৃতি সদনের শিল্পীরা গান ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন।

Back to top button