শিক্ষাসাহিত্যহাই লাইটস

‘নাটকীয়’ অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর সমাপ্তি

                                                                                                     ছবি: সংগৃহীত

এবারের বইমেলার প্রতিপাদ্য ছিল ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’। মেলায় মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়, যা ২০২৫ সালের ৭৮০টি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে মেলায় ছিল ১,০১৮টি ইউনিট

অনিশ্চয়তা, বারবার সময়সূচি পরিবর্তন এবং দর্শনার্থীর তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। প্রতিবছর ১ ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরু হলেও নানা জটিলতার কারণে এবার মেলা শুরু হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি

মাত্র ১৮ দিনের এই সংক্ষিপ্ত আয়োজন প্রকাশকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়েছে বলে জানা গেছে। মেলার শেষ দিনেই তথ্যকেন্দ্রে ২৩৬টি নতুন বই জমা পড়ে। এতে এবারের মেলায় প্রকাশিত নতুন বইয়ের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২,০০৭টি। এর বিপরীতে ২০২৫ সালে নতুন বই প্রকাশিত হয়েছিল ৩,২৯৯টি এবং ২০২৪ সালে ৩,৭৫১টি।

এবারের মেলার প্রতিপাদ্য ছিল ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’। মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়, যা ২০২৫ সালের ৭৮০টির তুলনায় অনেক কম। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রতিষ্ঠানকে জায়গা দেওয়া হয়। মেলায় মোট ইউনিট ছিল ১,০১৮টি।

প্রতি শুক্র ও শনিবার বিশেষ ‘শিশুপ্রহর’ আয়োজন করা হয়। মেলার নিরাপত্তায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কঠোর নজরদারি বজায় রাখে। প্রবেশপথে আর্চওয়ে, মেটাল ডিটেক্টর এবং কঠোরভাবে ম্যানুয়াল তল্লাশির ব্যবস্থা ছিল। পুরো মেলা প্রাঙ্গণ প্রায় ৩০০টি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রাখা হয়। পাশাপাশি টিএসসি, দোয়েল চত্বর ও হাকিম চত্বর এলাকায় যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ ও ডাইভারশন ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়।

প্রকাশকদের হতাশা

গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশক ঐক্য এবারের বইমেলা নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করে। সংগঠনটির দাবি, এবারের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি করোনাকালীন সময়ের চেয়েও খারাপ ছিল।

সংগঠনটি জানায়, ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে গত শনিবার পর্যন্ত ১৪ দিনে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বই বিক্রি অন্তত ৮০ শতাংশ কমেছে। প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশক স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচও তুলতে পারেননি বলে তারা জানিয়েছে। এমনকি প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকাশক ৫,০০০ টাকার বইও বিক্রি করতে পারেননি

প্রকাশকদের সংগঠনটি আরও জানায়, ২০২৫ সালের বইমেলায় ২০২৪ সালের তুলনায় বিক্রি ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। আর ২০২৬ সালে ২০২৫ সালের তুলনায় বিক্রি আরও ৮০ শতাংশ কমেছে

তবে স্টল ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফসহ সরকারের বিভিন্ন সহযোগিতাকে স্বাগত জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে আয়োজক হিসেবে বাংলা একাডেমিকেও ধন্যবাদ জানানো হয়।

শুরু থেকেই ছিল অনিশ্চয়তা

মেলা শুরুর আগেই আয়োজক ও প্রকাশকদের মধ্যে মতবিরোধের কারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। সংসদ নির্বাচন ও রমজানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরুর প্রস্তাবে ৩২১টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আপত্তি জানায়। পরে স্টল ভাড়া মওকুফ এবং ন্যায্যভাবে জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার আশ্বাসের পর শেষ পর্যন্ত ২৬ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরু হয়।

তবে রমজান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রত্যাশিত দর্শনার্থী সমাগম হয়নি। শেষ দিনে কিছুটা ভিড় দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে লেখক ও প্রকাশকদের বড় ধরনের লোকসানের হতাশা নিয়েই মেলা প্রাঙ্গণ ছাড়তে হয়েছে।

সমাপনী অনুষ্ঠান

রোববার বিকেল ৩টায় বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। মেলার সদস্যসচিব ড. মো. সেলিম রেজা মেলার প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক

অধ্যাপক আজম বলেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতায় বইমেলা সফলভাবে আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে এই আয়োজন আরও নতুন প্রত্যাশা তৈরি করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, জ্ঞানভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে বই অপরিহার্য। শিশুদের আবারও বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে এবং দেশজুড়ে গ্রন্থাগারের পরিধি বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

অধ্যাপক ফজলুল হক বলেন, মানসম্মত বই পাঠকের চেতনা জাগ্রত করে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ গঠনে বই পড়ার অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পুরস্কার প্রদান

এবারের বইমেলায় বিভিন্ন স্মারক পুরস্কার প্রদান করা হয়।

রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬:
সর্বাধিক সংখ্যক মানসম্মত শিশুতোষ বই প্রকাশের জন্য পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেডকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬:
নতুন অংশগ্রহণকারী প্রকাশকদের মধ্যে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য সহজ প্রকাশ এ পুরস্কার লাভ করে।

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬:
দৃষ্টিনন্দন ও চমৎকার স্টলসজ্জার জন্য ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশন্স, মাত্রা প্রকাশ এবং বেঙ্গলবুকসকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

Back to top button