স্বাস্থ্যহাই লাইটস

দেশে বাড়ছে হাম রোগের ঝুঁকি: প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাম্প্রতিক সময়ে দেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা গ্রহণে অবহেলা, সচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে রিপোর্টার মাহমুদ কথা বলেন ডা. ফারহা তাজনিন -এর সঙ্গে।

ডা. ফারহা তাজনিন  জানান, হামের প্রথম কয়েকদিন সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। নাক দিয়ে পানি পড়তে পারে। কারণ হামে ভাইরাস মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায় এজন্য উপসর্গগুলো শুরু হয়  নাক দিয়ে পানি পড়া, সঙ্গে জ্বর (১০৩-১০৫°), কাশি, গলা ব্যথা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া।

প্রায় ২-৪ দিন পর শরীরে লালচে ছোপ ছোপ ফুসকুড়ি প্রথমে মুখে দেখা যায়। তারপর গলায়, ঘাড়ে সারা শরীরে পড়ে। যা ৫-৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

হাম বা রুবিওলা ( Rubeola) একটি অত্যন্ত ছোয়াঁচে ও তীব্র ভাইরাসঘটিত সংক্রামক রোগ। প্যারামক্সিভাইরাস গোত্রের মর্বিলিভাইরাসগণের অন্তর্গত ভাইরাসের কারণে রোগটি ঘটে।

ডা. ফারহা তাজনিন  জানান, হাম রোগ ‘মিজলস ভাইরাস’-এর মাধ্যমে ছড়ায় এবং এটি অত্যন্ত সংক্রামক। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে খুব সহজেই আশপাশের অনেককে সংক্রমিত করতে পারে। বর্তমানে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও বিদ্যালয়গুলোতে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি।
তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা দেখছি, অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা নিচ্ছে না। এর ফলে তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না, যা হাম ছড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণগুলোর একটি।” তিনি আরও জানান, ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
হাম রোগের লক্ষণ হিসেবে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা যায়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা যেমন নিউমোনিয়া ও তীব্র দুর্বলতার ঘটনাও বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. ফারহা তাজনিন  বলেন, “প্রথমত, টিকাদান কর্মসূচিকে আরও জোরদার করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত টিকার আওতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো শিশুই টিকা থেকে বাদ না পড়ে।”
তিনি আরও বলেন, সরকারকে গণসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রচার কার্যক্রম চালাতে হবে। টেলিভিশন, রেডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে জোর দিতে হবে।
এছাড়া আক্রান্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ করা এবং রোগীদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জরুরি বলে তিনি মনে করেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।

চিকিৎসা

হাম এর নির্দিষ্ট কোন এন্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা হয়ে থাকে।আক্রান্ত হলে শরীরের সঠিক হাইড্রেশন বজায় রাখতে হবে এবং পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। জ্বর হলে ওষুধ দিয়ে জ্বর নিয়ন্ত্রণ করা এবং দুদিনের জন্য ভিটামিন এ সম্পূরক চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

হাম হলে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না।সতর্ক ও সচেতন  হতে  হবে। রোগীকে আইসলেশনে রাখতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং ভ্যাকসিন সময় মতো দিয়ে দিতে হবে  এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।

সবশেষে ডা.  ফারহা তাজনিন বলেন, “হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। যদি আমরা সবাই সচেতন হই এবং সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেয়, তাহলে এই পরিস্থিতি খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।”

বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্পষ্টভাবে বলা যায়, হাম রোগ প্রতিরোধে ব্যক্তি সচেতনতার পাশাপাশি সরকারের কার্যকর উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই দেশকে এই সংক্রামক রোগের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

Back to top button