দুই কৃষি কর্মকর্তার হাতে জিম্মি লাখো দরিদ্র কৃষক চুয়াডাঙ্গায় কৃষি সেবায় ভোগান্তি বাড়ছে

চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসদাচরণের অভিযোগে ক্ষোভ বাড়ছে কৃষকদের মাঝে। চুয়াডাঙ্গা জেলার উপপরিচালক (ডিডি) মো. মাসুদুর রহমান এবং দামুড়হুদা উপজেলার উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াহেদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের প্রভাব সরাসরি পড়ছে মাঠপর্যায়ের কৃষি কার্যক্রমে।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা এবং নিয়মিত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, যোগদানের পর থেকেই তিনি দীর্ঘ সময় অফিসের গেস্টরুমে অবস্থান করছেন। পরিবার রংপুরে থাকায় প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার কর্মস্থল ত্যাগ করে রংপুরে যান এবং রোববার ফিরে আসেন। এতে জেলার সার্বিক কৃষি কার্যক্রম, বিশেষ করে সার বিতরণ তদারকি, মাঠপর্যায়ের মনিটরিং এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি কিছুদিনের জন্য (প্রায় চার মাস) মেসে অবস্থান করলেও বর্তমানে আবারও গেস্ট রুমেই থাকছেন বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, জেলার প্রধান কর্মকর্তা নিয়মিত উপস্থিত না থাকায় অধীনস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে জবাবদিহির অভাব তৈরি হয়েছে, যা বিভিন্ন অনিয়মকে উৎসাহিত করছে। একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নেতৃত্বের দুর্বলতার সুযোগে নিচের স্তরে নানা অনিয়ম বেড়ে গেছে।
এদিকে কৃষকদের প্রধান অভিযোগ সারের কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি নিয়ে। অনেক কৃষক অভিযোগ করেছেন, বিসিআইসি ডিলারদের কাছে গেলে সার পাওয়া যায় না, কিন্তু খোলা বাজারে গেলেই বেশি দামে সার পাওয়া যায়। চুয়াডাঙ্গার গাড়াবাড়িয়া এলাকার কৃষক মনির হোসেন বলেন, ডিলারের কাছে গেলে বলে নাই, কিন্তু দোকানে গেলে এক হাজার টাকার সার এক হাজার ছয়শ টাকায় কিনতে হচ্ছে। আমরা চাষ করি, কিন্তু সময়মতো সার পাই না। পরে বেশি দামে কিনতে হয়, এতে আমাদের লোকসান হয়।
কৃষকদের অভিযোগ, এই সংকটের পেছনে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের যোগসাজশ রয়েছে। উপপরিচালকের বিরুদ্ধে ডিলারদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তারা।
অন্যদিকে দামুড়হুদা উপজেলার উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াহেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আরও বিস্তৃত। তার বিরুদ্ধে বালাইনাশক লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নতুন লাইসেন্সের জন্য ৩৪৫ টাকা এবং নবায়নে ২৩০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, আবেদনকারীদের কাছ থেকে কয়েকগুণ বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী একাধিক কৃষক এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসে লিখিত অভিযোগ করেছেন। লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে লাইসেন্স দেওয়া হয়নি বা দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে মো. আব্দুল ওয়াহেদকে গত ১১ মার্চ দুটি পৃথক শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রথম শোকজে তার বিরুদ্ধে সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ, অশালীন ভাষা ব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বদলির হুমকি দেওয়া, অফিস শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং বালাইনাশক সংক্রান্ত কাজে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, এসব আচরণ সরকারি কর্মচারী আচরণবিধির পরিপন্থী।
দ্বিতীয় শোকজে আরও নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, বালাইনাশক লাইসেন্সের নতুন আবেদন ও নবায়নের ক্ষেত্রে তিনি সরকারি নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছেন, যা বিধিবহির্ভূত এবং দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। শোকজ নোটিশে তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
তবে অভিযোগকারী কৃষকরা বলছেন, শোকজ দেওয়া হলেও আব্দুল ওয়াহেদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে করে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
শুধু কৃষকরাই নন, দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীও মো. আব্দুল ওয়াহেদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাদের অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি নিয়মিত সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, সহযোগিতা করেন না এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ভয় দেখান। নারী সহকর্মীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এতে অফিসে একটি অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপপরিচালক মাসুদুর রহমানের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াহেদ এসব অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার মিলছে না।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, কোনো সমস্যা নিয়ে কর্মকর্তাদের কাছে গেলে তারা সমাধান না দিয়ে এড়িয়ে যান। অনেক ক্ষেত্রে অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকার হতে হয়। এতে কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং সরকারি কৃষি সেবার প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কৃষি খাত আরও বড় সংকটে পড়বে। তারা সুষ্ঠু কৃষি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।