জলবায়ু পরিবর্তন

নদীভাঙন ও বন্যায় বিপর্যস্ত জনপদ জামালপুর

নদীভাঙন ও বন্যায় বিপর্যস্ত জনপদ জামালপুর

  • যাতায়াতব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় চরের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা প্রায় পৌঁছেই না।
  • বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুরা নিয়মিত টিকা ও জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
  • বন্যায় কৃষকেরা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। জীবন বাঁচাতে পৈতৃক পেশা ছেড়ে অনেকেই ঢাকা বা অন্য শহরে নিম্ন আয়ের কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
  • দুর্গম যাতায়াতব্যবস্থার কারণে বিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগ শিক্ষক জেলা শহরে থাকেন। ক্লাস চলে প্রক্সি শিক্ষক ও দপ্তরি দিয়ে।
  • নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের অভাব এবং ১৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অব্যবহৃত পড়ে আছে।
  • সমন্বিত মহাপরিকল্পনা না থাকায় দৃশ্যমান উন্নয়ন মানুষের কোনো সরাসরি উপকারে আসছে না। 

    জামালপুর জেলার বেশির ভাগ এলাকা ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীসংলগ্ন। প্রতিবছর নদীভাঙন, বন্যায় ঘরবাড়িসহ সবকিছু হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয় হাজারো মানুষ। একদিকে দুর্যোগ আর অন্যদিকে কর্মসংস্থান না থাকায় মানুষ অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। এসব মানুষের না আছে স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা, না আছে শিক্ষার আলো। বসতভিটাসহ স্কুলভবন নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় অকালে ঝরে পড়ছে বহু শিক্ষার্থী। সরকারের সঠিক পরিকল্পনার অভাবে উন্নয়নের ছোঁয়াও সেভাবে লাগে না জামালপুরে। যুগের পর যুগ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন এ অঞ্চলের মানুষ।

    জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, বকশীগঞ্জ ও সরিষাবাড়ীতে প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দেয়। যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদ–নদীবেষ্টিত এলাকার বন্যায় লক্ষাধিক মানুষ কয়েক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দী অবস্থায় থাকেন। অন্যদিকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর দেখা দেয় ভয়াবহ ভাঙন।

    ব্রহ্মপুত্র ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ, যমুনা, ঝিনাই, দশানী, জিঞ্জিরাম, আলাই ও মরা জিঞ্জিরাম নদ–নদী প্রবাহিত হয়েছে জামালপুর জেলার মধ্য দিয়ে। নদ–নদীগুলোর মধ্যে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রে বন্যা ও ভাঙন প্রতিবছরের চিত্র। নদীর কারণে জেলায় অসংখ্য চর রয়েছে।

    যমুনার বুকে জেগে ওঠা জামালপুর অংশের চরগুলো হলো ইসলামপুর উপজেলার জিগাতলা, সিন্ধুরতলী, শিলদহ, মন্নিয়া, বরুল, চর বরুল, চেঙ্গানিয়া, কাসারিডোবা, চর শিশুয়া, ইনডুলেমারী, কোদালধোয়া, মণ্ডলপাড়া, প্রজাপতি, বিশরশি, সাপধরি ও বীরনন্দনের পাড়া, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার টিনেরচর, মাদারগঞ্জ উপজেলার পাকরুল, আতামারি ও হিদাগাড়ি চর এবং সরিষাবাড়ী উপজেলার নলসন্ধ্যা চর। এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী এলাকায় কয়েকটি চর রয়েছে।

    এসব চরে নদীভাঙনের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে রয়েছে খরার প্রকোপ। মৌলিক নাগরিক সুযোগ–সুবিধা থেকে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত। যোগাযোগব্যবস্থা ভঙ্গুর। আর স্বাস্থ্যসেবা তাঁদের কাছে একপ্রকার দুর্লভ। এখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত নানা রোগব্যাধির সম্মুখীন হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।

    বন্যার হানা

    প্রতিবছর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি ও টানা বৃষ্টিতে জামালপুর জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিস্তীর্ণ জনপদ, সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ফসল। বন্যার সময় কয়েক সপ্তাহ ধরে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় থাকেন।

    ২০২০ সালে জামালপুরে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় হয়। জেলার ৭৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। কয়েকটি জায়গায় সড়কের সঙ্গে রেলযোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়। খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে লাখো মানুষ। দীর্ঘ সময় পানি থাকায় দেখা দিয়েছিল মানুষ ও গবাদিপশুর খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।

    জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের বন্যায় সাতটি উপজেলার ৪৬টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়। একই সঙ্গে চারটি পৌরসভাও বন্যাকবলিত হয়। ওই ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৪৯০টি গ্রামের ৫ লাখ ৯৮ হাজার ২১৭ জন মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছিল। বন্যায় ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ২৫টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৫ হাজার ৪৯২ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছিল, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪০ কোটি টাকা। ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।

Back to top button