শিক্ষাসাহিত্য

বিলম্ব ও মতবিরোধের অবসান, বৃহস্পতিবার বাংলা একাডেমি পুরস্কার দিয়ে শুরু একুশে বইমেলা

বারবার তারিখ পরিবর্তন ও নানা অনিশ্চয়তার পর অবশেষে বৃহস্পতিবার বিকেলে শুরু হচ্ছে বইপ্রেমীদের প্রিয় সাহিত্য উৎসব অমর একুশে বইমেলা ২০২৬

মেলা শুরুর আগে প্রকাশকেরা নিজেদের স্টল প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। অন্যদিকে, মাসব্যাপী এই সাহিত্য উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে চলছে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি।

বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেলার উদ্বোধন করবেন। এ সময় তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন। পরে তিনি মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখবেন।

এবারের বইমেলার প্রতিপাদ্য ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’। এর মধ্য দিয়ে দেশের সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে উদযাপন করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

সাধারণত ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনেই বইমেলার উদ্বোধন করা হয়। তবে জাতীয় নির্বাচন ও রমজানের কথা বিবেচনায় নিয়ে এবার আয়োজকেরা প্রথমে ডিসেম্বর মাসে মেলা আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিলেন।

পরে সময়সূচি দুই দফা পরিবর্তন করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ২৬ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সোমবার বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগ ২০২৫ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ীদের তালিকা প্রকাশ করে।

পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন—কবিতায় মোহন রায়হান, কথাসাহিত্যে নাসিমা আনিস, প্রবন্ধ ও গদ্যে সৈয়দ আজিজুল হক, শিশুসাহিত্যে হাসান হাফিজ, অনুবাদে আলী আহমদ, গবেষণায় মোস্তফা মজিদ ও ইসরাইল খান, বিজ্ঞানবিষয়ক লেখায় ফারসিম মান্নান মোহাম্মদী এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনায় মুয়ীদুল হাসান

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা শুভেচ্ছা বক্তব্য দেবেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক

আয়োজকেরা আশা করছেন, এবারের বইমেলা একটি জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে।

অধ্যাপক আজম বলেন, “আমরা আশা করছি, এবারের মেলা পাঠক ও লেখকদের একটি প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হবে। এ আয়োজনে আমরা সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।”

৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে

এবারও বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে অনুষ্ঠিত হবে একুশে বইমেলা। মেলায় অংশ নিচ্ছে মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান

এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে থাকবে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১,০১৮টি ইউনিট

মেলা পরিচালনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৭০৮টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ১,০৮৪টি ইউনিট নিয়ে অংশ নিয়েছিল। অর্থাৎ এ বছর মেলায় প্রকাশকদের অংশগ্রহণ কমেছে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চের কাছে গাছের নিচে বিশেষ লিটল ম্যাগাজিন চত্বর তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ৮৭টি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য স্টল থাকবে।

শিশুদের জন্য নির্ধারিত অংশে ৬৩টি প্রতিষ্ঠানকে ১০৭টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব সেলিম রেজা জানান, এবারের মেলার বিন্যাস গত বছরের মতোই রাখা হয়েছে। তবে নকশায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, রমজান মাসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তারাবির নামাজের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও থাকবে।

মেলার সময়সূচি

এবারের বইমেলা চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত।

প্রতিদিন মেলা খোলা থাকবে দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। তবে ছুটির দিনগুলোতে মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায়। প্রতিদিন রাত ৮টা ৩০ মিনিটে মেলায় প্রবেশ বন্ধ হয়ে যাবে।

প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত মূল মঞ্চে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

শুক্র ও শনিবার বিশেষ শিশুপ্রহর অনুষ্ঠিত হবে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত। এতে চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ইনস্টিটিউট (আইইবি) প্রাঙ্গণের সীমানা ঘেঁষে এবারও খাবারের স্টল থাকবে।

বাংলা একাডেমি ও অংশগ্রহণকারী প্রকাশকেরা বই বিক্রির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ কমিশন রাখবেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নির্ধারিত হারে বই বিক্রি করবে।

নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা অনুষ্ঠান হবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।

মেলার প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে একাধিক আর্চওয়ে থাকবে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে বাংলাদেশ পুলিশ, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। পুরো মেলা প্রাঙ্গণ সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারির আওতায় থাকবে।

আয়োজকেরা জানিয়েছেন, এবারের মেলা পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত থাকবে।

নতুন প্রকাশকদের জন্য নতুন পুরস্কার

মানসম্মত প্রকাশনা ও স্টলসজ্জার জন্য এবারের বইমেলায় কয়েকটি পুরস্কার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ।

২০২৫ সালে প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে গুণগত মানের বিচারে সেরা বইয়ের প্রকাশককে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার দেওয়া হবে।

মেলায় প্রকাশিত বইয়ের নান্দনিক ও শৈল্পিক মানের জন্য তিনটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার দেওয়া হবে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ বইয়ের জন্য একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার। আর মেলার সেরা সজ্জিত স্টলের জন্য দেওয়া হবে কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার

এবার নতুন করে চালু হচ্ছে সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার

২০২৪ বা ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো বইমেলায় অংশ নেওয়া নতুন প্রকাশকদের এই পুরস্কারের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। প্রকাশিত বইয়ের মান ও সংখ্যার ভিত্তিতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কার দেওয়া হবে।

বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের বইমেলার ব্যবস্থাপনা সহযোগী হিসেবে বর্তমান বাংলা লিমিটেড দায়িত্ব পালন করছে।

কেন বিলম্ব হলো

প্রথমে বাংলা একাডেমি জাতীয় নির্বাচনের আগেই ডিসেম্বর মাসে বইমেলা আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল।

তবে গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর বাংলা একাডেমি জানায়, ওই পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়েছে।

এরপর ২ নভেম্বর বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস) সঙ্গে বৈঠকের পর নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলা একাডেমি।

পরে নির্বাচন কমিশন ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের তারিখ নির্ধারণ করে।

এরপর বাংলা একাডেমি ঘোষণা দেয়, বইমেলা শুরু হবে ২০ ফেব্রুয়ারি

কিন্তু প্রকাশকেরা ঈদের পর মেলা আয়োজনের দাবি জানান। অন্যদিকে, বাপুস সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা ভাষাশহীদ দিবসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২১ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরুর প্রস্তাব দেন।

শেষ পর্যন্ত বাংলা একাডেমি ২৫ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরুর তারিখ ঘোষণা করে। তবে পরে আয়োজকেরা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৬ ফেব্রুয়ারি মেলার উদ্বোধনের জন্য সময় দিয়েছেন।

১৯৭২ সাল থেকে একুশে বইমেলার যাত্রা

একুশে বইমেলার ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭২ সালে। ওই বছর মুকধারা প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জন সাহা ভাষা দিবস স্মরণে ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির ফটকের সামনে চট বিছিয়ে বই বিক্রি শুরু করেন।

১৯৭৪ সালে একুশের অনুষ্ঠানের সময় মুকধারা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি ছোট স্টল স্থাপন করে।

১৯৭৭ সালের মধ্যে আরও কয়েকজন প্রকাশক এতে যোগ দেন। এভাবেই ধীরে ধীরে বইমেলার অনানুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা একাডেমিকে এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করেন। পরের বছর বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতিও এতে যুক্ত হয়।

১৯৮৩ সালে মহাপরিচালক মঞ্জুরে মওলার সময়ে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নামে আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত নীতিমালার অধীনে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মেলা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১৯৮৪ সালে

এরপর কয়েক দশকে একুশে বইমেলা ভাষা ও সাহিত্যকে ঘিরে মাসব্যাপী এক বৃহৎ উৎসবে পরিণত হয়েছে।

২০২০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘গ্রন্থমেলা’র পরিবর্তে পাঠকদের জন্য ‘বইমেলা’ শব্দটি বেশি সহজ ও গ্রহণযোগ্য বলে মত দেন।

এরপর ২০২১ সাল থেকে আয়োজনটির আনুষ্ঠানিক নাম করা হয় ‘অমর একুশে বইমেলা’

Back to top button