জলবায়ু সংকটে এখনো প্রাসঙ্গিক জিয়ার পরিবেশনীতি

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেওয়া খাল খনন কর্মসূচি।ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ এক গভীর দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে দৃশ্যমান উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, উড়ালসড়ক। অন্যদিকে প্রতিদিন নীরবে ক্ষয়ে যাচ্ছে নদী, ভরাট হচ্ছে জলাশয়, ডুবে যাচ্ছে শহর। উন্নয়নের এই দৌড়ে পরিবেশ যেন পেছনে ফেলে আসা এক বিস্মৃত ঘটনা। অথচ স্বাধীনতার পরপরই, যখন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, তখনই একজন রাষ্ট্রনায়ক পরিবেশ ও জলসম্পদকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের জায়গায় নিয়ে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন জিয়াউর রহমান।
জিয়ার সময়ে গৃহীত খাল খনন, নদী পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ কিংবা আন্তর্জাতিক পরিসরে পানির অধিকার নিয়ে তাঁর অবস্থানকে নিছক অতীতচর্চা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের বর্তমান সংকটের শিকড় যেমন দেখায়, তেমনি সমাধানের দিকনির্দেশনাও দেয়।
১৯৭৭ সালে স্বনির্ভর বাংলাদেশ কর্মসূচির অংশ হিসেবে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে খাল খনন কার্যক্রম শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান। তাঁর কাছে খাল ছিল শুধু কৃষি সেচের অবকাঠামো নয়, বরং বন্যা নিয়ন্ত্রণ, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং পানি ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় উপাদান। মাত্র তিন বছরে প্রায় ২ হাজার ২০০ মাইল খাল খননের মাধ্যমে প্রায় ৮ লাখ একর জমিকে সেচের আওতায় আনা হয়েছিল। আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এই পরিসংখ্যান শুধু বিস্ময় জাগায় না, প্রশ্নও তোলে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশ খাল দখল বা ভরাট হয়ে গেছে। এর ফল আমরা প্রতিবার বর্ষায় দেখি শহরজুড়ে জলাবদ্ধতার মাধ্যমে। আবার শুষ্ক মৌসুমে কৃষক তাকিয়ে থাকেন আকাশের দিকে। খালগুলো টিকিয়ে রাখা গেলে পানি ধরে রাখার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা আজও কার্যকর থাকত।
নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও জিয়ার উদ্যোগ ছিল সুস্পষ্ট। তাঁর শাসনামলে অন্তত ২৫টির বেশি নদী পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তিস্তা, আড়িয়াল খাঁ, ধলেশ্বরী, করতোয়া নদীর মতো প্রবাহগুলো আংশিক হলেও সচল রাখা হয়েছিল। অথচ বর্তমানে নদী গবেষকদের মতে, ষাটের দশকে যেখানে দেশের নদীর সংখ্যা ছিল সাড়ে সাত শর বেশি, সেখানে এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ২৩০টিতে। গত পাঁচ দশকে হারিয়ে গেছে প্রায় ৫২০টি নদী।
এই সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর খরায় ক্ষতির পরিমাণ গড়ে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা এবং বন্যায় ক্ষতি হয় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই পটভূমিতে বিএনপি তাদের ঘোষিত পরিকল্পনায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী খননের কথা বলেছে। বাস্তবায়নের প্রশ্ন থাকলেও আলোচনার কেন্দ্রে নদীকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি নিজেই গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশ ভাবনার আরেকটি বড় স্তম্ভ ছিল বৃক্ষরোপণ। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে বৃক্ষরোপণ অভিযান শুরু হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৯৮০ সালেই এক মৌসুমে প্রায় ৫৫ লাখ গাছ লাগানো হয়েছিল। অথচ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের বনভূমি নেমে এসেছে ১১ শতাংশের নিচে। যেখানে জাতীয় নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই হার অন্তত ২৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন।
এই বাস্তবতায় বিএনপি তাদের পরিকল্পনায় ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কথা বলছে। প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার ও নাগরিক সমাজ সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে এটি কি সত্যিই অসম্ভব।