জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানী খাতে বিনিয়োগ সামান্য

বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো। তা সত্বেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এসব কোম্পানির বিনিয়োগ অত্যন্ত সীমিত।
বার্সেলোনার ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ইউনিভার্সিটি অব অটোনোমা দে বার্সেলোনা (আইসিটিএ-ইউএবি)-এর এক নতুন গবেষণা বলছে, বিশ্বের বৃহত্তম তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলোর মধ্যে মাত্র ১দশমিক ৪২ শতাংশে বিনিয়োগ করেছে।
প্রতিবেদনটি আজ বৃহস্পতিবার (৯ সেপ্টেম্বর) ন্যাচার সাসটেইনিবিলিটি জার্নালে প্রকাশিত হয়। গবেষণাটি জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর প্রচারণা ও বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে বৈপরীত্য তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদনে তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো নিজেদের ‘ভবিষ্যতের জ্বালানি প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তব তথ্য বলছে, নবায়নযোগ্য খাতে তাদের উপস্থিতি প্রায় ‘প্রতীকী’পর্যায়ের।
গবেষক দল গ্লোবাল এনার্জি মনিটর-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বের ২৫০টি বৃহত্তম তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে পর্যবেক্ষণ করেছেন—যারা সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক হাইড্রোকার্বন উৎপাদনের ৮৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তারা শনাক্ত করেছেন ৩হাজার১৬৬টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প—যার মধ্যে বায়ু, সৌর, জলবিদ্যুৎ ও ভূ-তাপীয় প্রকল্প রয়েছে—যেখানে এই কোম্পানিগুলোর সরাসরি, সহযোগী বা অধিগ্রহণের মাধ্যমে অংশগ্রহণ রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই ২৫০ কোম্পানির মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ কোনো নবায়নযোগ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, এবং তাদের মোট প্রাথমিক জ্বালানি উৎপাদনের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ০দশমিক ১ শতাংশ।
গবেষণার প্রধান লেখক ও আইসিটিএ-ইউএবি এর গবেষক মার্সেল ল্যাভেরো-পাসকুইনা বলেন, ‘তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ নামমাত্র পর্যায়ের। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় তাদের অবদান বিচার করতে হবে তারা কতটুকু জীবাশ্ম জ্বালানি মাটির নিচে রেখে দিতে পারে, সেটির ভিত্তিতে।’
জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস-এর তথ্যানুসারে, শীর্ষ ১০০ তেল ও গ্যাস কোম্পানির প্রায় এক-চতুর্থাংশ ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছে—যার গড় প্রতিশ্রুতি তাদের নিজস্ব কার্যক্রমে ৪৩ শতাংশ হ্রাস।
তবে আইসিটিএ-ইউএবি এর বিশ্লেষণ বলছে, এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পরিষ্কার জ্বালানিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগে রূপ নেয়নি।
গবেষণাটি নীতিনির্ধারক, বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা—যারা এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে জলবায়ু পদক্ষেপের ‘অংশীদার’ হিসেবে বিবেচনা করে।
ল্যাভেরো-পাসকুইনা বলেন,’দশকের পর দশক ধরে ফাঁকা প্রতিশ্রুতির পর এখন সময় এসেছে সরকার ও জনপ্রতিষ্ঠানগুলোর উপলব্ধি করার যে জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্প কখনোই সমাধানের অংশ নয়—বরং সমস্যারই অংশ। জলবায়ু ও জ্বালানি নীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাদের কোনো আসন থাকা উচিত নয়।’
সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব লসান-এর অধ্যাপক জুলিয়া স্টেইনবার্গার বলেন, ‘এই গবেষণা আবারও প্রমাণ করে যে তেল, গ্যাস ও কয়লা শিল্প বাস্তবে কোনো রূপান্তর ঘটাতে পারছে না। সবুজ স্লোগান দিলেও এসব কোম্পানি আসলে কার্বন নির্গমন কমাচ্ছে না।’
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানি লবিগোষ্ঠী ও থিংক ট্যাঙ্কগুলো এখনো রাজনীতিকদের প্রভাবিত করছে, যার ফলে জরুরি পদক্ষেপে বিলম্ব হচ্ছে।’
গ্লোবাল এনার্জি মনিটর-এর গ্লোবাল সোলার পাওয়ার ট্র্যাকার প্রকল্প ব্যবস্থাপক ক্যাসান্দ্রা ও’মালিয়া বলেন,’তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো নবায়নযোগ্য খাতে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির মতো বিনিয়োগ করছে না। এর বিপরীত দাবি করা আসলে গ্রীনওয়াশিং ছাড়া আর কিছু নয়।’
আইসিটিএ-ইউএবি-এর গবেষক দল বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভর করে জ্বালানি রূপান্তর এগিয়ে নেওয়া একেবারেই ভুল দিকনির্দেশনা। প্রকৃত অগ্রগতি আনতে হলে নীতি ও অর্থায়ন জীবাশ্ম স্বার্থ থেকে সরিয়ে প্রকৃত পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে নিতে হবে।